শুক্রবার, ১০ Jul ২০২৬, ০৩:৪২ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : করোনা পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের কেউ বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে নিয়মিত আদালত চালু হলে সংক্রমণ আরও বেড়ে যাবে। একমাত্র উপায় হচ্ছে, নিষ্পত্তিযোগ্য মামলাগুলোর শুনানি করা যেতে পারে। দুর্যোগকালীন সময়ে ভার্চুয়াল আদালতের কোনো বিকল্প নেই।
আবার কেউ বলছেন, গত চার মাসে দেশের সব প্রতিষ্ঠান চালু হয়ে গেছে। আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে সবচেয়ে কম কাজ হয়েছে। এ পরিস্থিতে আইনজীবীদের একটি বিরাট অংশ চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সমস্যাটিকে বড় করে না দেখে সমস্যার সমাধান করতে প্রধান বিচারপতিকে উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যুগান্তরকে শনিবার বলেন, ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে আইন হয়ে গেছে। এটা বিশেষ পরিস্থিতি এবং বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। এর পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার জন্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধি এবং সাক্ষ্য আইন সংশোধন করতে হবে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি চারটা বার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কথা বলে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছি, স্বাভাবিকভাবে যেন আদালত চালু করা হয়। তিনি আত্মসমর্পণ এবং হাজিরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। মন্ত্রী বলেন, ফুলকোর্ট সভা হয়েছে, এখন নিম্ন আদালতের কার্যক্রম বাড়ানোর কথা। আমি অনুরোধ করব যেন সীমিত পরিসরে নিয়মিত কোর্ট চালু হয়। ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে আইনজীবীদের আন্দোলন করার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, তাদের বক্তব্য আমি প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছি। ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। রোববার থেকে শুরু হওয়ার কথা। করোনাভাইরাস বিস্তার ঠেকাতে মার্চ মাসে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে আদালতও বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ছুটির মধ্যে বিচার কাজ থেমে যাওয়ায় ভার্চুয়াল আদালতের ভাবনা গতি পায়। যেখানে আইনজীবী, বিচারক, আসামি, বাদী কিংবা আদালতকর্মী কেউই একসঙ্গে না বসেই শুনানি নিতে পারেন। ভিডিও কনফারেন্সসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ রেখে ৭ মে মন্ত্রিসভা এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশের খসড়ায় অনুমোদন দেয়ার পর তার ভিত্তিতে ভার্চুয়াল আদালতের কাজ শুরু হয়ে যায়। এই ভার্চুয়াল আদালতে শুধু জামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শুনানিই হচ্ছে। তবে অনভ্যস্ততা ও অপ্রতুল অবকাঠামোর কারণে ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে আইনজীবীদের অস্বস্তি রয়েছে।
জানা গেছে, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আদালতে বিচার কাজ পরিচালনা ও দায়িত্ব পালনের সময় সারা দেশে এ পর্যন্ত অধস্তন আদালতের ৪০ জন বিচারক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া সুপ্রিমকোর্টের ৪৫ জন কর্মচারী ও অধস্তন আদালতের ১৩৬ জন কর্মচারীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। সর্বশেষ পাওয়া খবরে মোট সুস্থ হয়েছেন অধস্তন আদালতের ৩৫ জন বিচারক ও একজন মারা যান। ১১ মে থেকে মূলত দেশের অধস্তন আদালতে শুরু হয় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার শুনানি। ৮ জুলাই ভার্চুয়াল আদালত ‘প্রয়োজন অনুসারে’ চালানোর বিধান রেখে সংসদে বিল পাস হয়। তবে এই আদালত পরিচালনার পর আইনজীবীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
আইনজীবীদের একটি বড় অংশের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ভার্চুয়াল আদালত বন্ধ করে নিয়মিত আদালত চালুর দাবি জানিয়ে আসছে তারা। কয়েক দফা মানবন্ধন করে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপিও দেয়া হয়েছে। ৮ জুলাই স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অবিলম্বে সুপ্রিমকোর্টসহ দেশের সব আদালত নিয়মিতভাবে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ জানায় সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি। আবেদনে বলা হয়, সরকার ইতোমধ্যে সাধারণ ছুটি বাতিল করেছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, কলকারখানা, মার্কেট ও গণপরিবহন চালু হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়মিত আদালতের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। আইনজীবীরা যথাযথভাবে পেশা পরিচালনা করতে না পারায় আর্থিক সংকটে পড়ছেন। অন্যদিকে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অবিলম্বে নিয়মিত আদালত চালুর পক্ষে সমিতির কার্যকরী কমিটি অভিমত প্রকাশ করছে। এ নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানান সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
এদিকে সুপ্রিমকোর্টের ফুলকোর্ট সভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভার্চুয়াল আদালত আপাতত বহাল থাকবে। ভার্চুয়াল আদালতের আকার আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ভার্চুয়াল আদালত অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, আদালত খুলে দিলে কোভিট-১৯ সংক্রমণ বেড়ে যাবে। এ থেকে বাঁচার জন্য যেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়। যেমন জামিন আবেদন দু’পক্ষকে শুনে আদেশ দিতে পারেন। আসামি হাজির করে দীর্ঘদিন সাক্ষ্যগ্রহণ করে শুনানি করা ভার্চুয়াল আদালতে সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইনজীবীরা এখন বাড়ি অথবা চেম্বারে থেকে এবং বিচারকরা চেম্বারে বসে অথবা বাসায় থেকেও জরুরি বিষয়গুলো শুনানি করতে পারছে। আশা করি আরও এক মাস গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সাবেক আইনমন্ত্রী বলেন, পুরোপুরি আদালত খুলে দেয়া বাস্তবতার নিরিখে সম্ভব নয়। আইনজীবীদের ধৈর্য ধরতে হবে।
ভার্চুয়াল আদালতের বিরোধিতা করে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে আদালতে বিচারক এবং আইনজীবীরা কেন আসেন? অবশ্যই বিচারপ্রার্থীদের জন্য। সেই বিচারপ্রার্থীদের কথা কেউই বলছেন না। আমরা সবাই বলছি বিচারকদের কি হবে, আইনজীবীদের কি হবে? বিচারপ্রার্থী না থাকলে তো বিচারক ও আইনজীবীর কোনো দরকার নেই। তিনি বলেন, বিচারপ্রার্থীর কি হচ্ছে সেটা কেউ জিজ্ঞেস করছে না। আসল জায়গায় কেউ যাচ্ছে না। এখন যদি বলি হাসপাতালের ডাক্তারদের রোগ হবে বলে তো হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে পারেন না। রোগীর চিকিৎসা করতে গেলে ডাক্তাররা রোগাক্রান্ত হবেন এজন্য হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়ার কথা তো কেউ বলছে না। ড. শাহদীন মালিক বলেন, আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেটা সবচেয়ে কম কাজ করছে। আদালত বন্ধ আছে, কোনো আলোচনা নেই। তার অর্থ আমরা নিজেরাই প্রমাণ করছি, দেশ-জাতির জন্য আদালত গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমস্যার সমাধান করতে প্রধান বিচারপতিকে উদ্যোগ নিতে হবে।
নগরকন্ঠ.কম /এআর